বাঙ্গালী জাতির দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

জাতীয়


সাইফুল ইসলাম জয় (হেলাল শেখ): বাঙ্গালী জাতির দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পদ্মা নদীর উপর বহুমুখী “পদ্মা সেতু” উদ্বোধন করেছেন বঙ্গকন্যা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বহু-প্রত্যাশিত পদ্মা নদীর উপর পদ্মা সেতু উদ্বোধন করায় দেশের অবাধ সমৃদ্ধির দ্বার উন্মোচিত হলো।
শনিবার (২৫ জুন ২০২২ইং) সকাল ১১টার দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে পদ্মা সেতুর ফলক উন্মুক্ত করেন। এ সময় সেখানে দলটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও বিদেশী কুটনীতিকসহ হাজারো বিিিশষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিতছিলেন। অবশেষে, প্রমত্তা পদ্মানদী বশীভূত করা গেলো। এর ফলে পদ্মার উভয় পাড়ে ব্যবসা বাণিজ্্য ও ব্যবসা করা লোকজনকে আর অসহায়ের মতো বসে থাকতে হবে না। এই সেতুর সংযোগের মাধ্যমে তারা এখন উভয় দিক যুক্ত হলো।
জানা গেছে, রবিবার ২৬ জুন থেকে দক্ষিণা লের জনগণ সরাসরি সড়ক পথে ঢাকায় যেতে পারবেন। এর মধ্যদিয়ে তারা ফেরি ঘাটের যন্ত্রণাদায়ক দুঃখস্বপ্ন থেকে মুক্তি পাচ্ছেন। তারা এ সেতুর উপর দিয়ে মাত্র ছয় মিনিটে এ নদী পাড় হবেন। বিশেষ করে স্বপ্নের এই পদ্মা সেতু কেবলমাত্র রাজধানী ঢাকা ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমা লের মধ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সরাসরি সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপন করেনি না বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ব্যাপক সংযোগ ও বাণিজ্যের দ্বারা খুলে দিলো। এছাড়া, এই সেতু সাধারণভাবে সারাদেশের পাশাপাশি বিশেষ করে দক্ষিণা লের ২১টি জেলার সমৃদ্ধি আনয়নের ক্ষেত্রে পরিবহন সময় ও অন্য ব্যয় হ্রাসের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাব রাখবে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে করে মাওয়ায় পোঁছান এবং পদ্মা সেতুর পদ্মা সেতুর শুভ উদ্বোধন উপলক্ষ্যে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সমাবেশ অংশগ্রহণ করেন। নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত দেশের বৃহত্তম এই মেগা প্রকল্পের উদ্বোধনের অংশ হিসেবে ঐতিহাসিক এই শুভ মুহুর্তটিকে স্মরণীয় করে রাখতে তিনি স্মারক ডাক টিকিট, স্মারকপত্র ও উদ্বোধনী খাম অবমুক্ত করেন এবং একটি বিশেষ সীল মোহর ব্যবহার করেন। এই সেতু মোট জাতীয় উৎপাদনে ১, ২ থেকে ২ শতাংশ যোগ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিজ হাতে টোল প্রদানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা বহুমুখী সেতু অতিক্রমের টোল প্রদান প্রক্রিয়ার উদ্বোধন করেন। দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হচ্ছেন টোল প্রধানের মাধ্যমে পদ্মা সেতু পার হওয়া একমাত্র প্রথম ব্যক্তি। পরে তিনি তিনজন সমাবেশে যোগ দিতে জাজিরা পয়েন্টে যান। ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারের ওপর প্রথম স্প্যান স্থাপনের মধ্যদিয়ে পদ্মা সেতু দৃশ্যমান হয়। পরে, একের পর এক ৪১টি স্প্যানের সবক’টি ৪২টি পিলারের উপর স্থাপন করা হয়। ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর এর সর্বশেষ ৪১তম স্প্যান বসানোর মধ্যদিয়ে ৬. ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বহুমুখী পদ্মা সেতুর পুরো অবকাঠামো দৃশ্যমান হয়। নিজস্ব অর্থায়নে এ সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ৩০ হাজার ১৯৩৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়। মূল সেতুর নির্মাণ ব্যয় হচ্ছে ১২ হাজার ১৩৩ কোটি ( ৪০০ কেভি স ালন লাইন টাওয়ার ও গ্যাস লাইনের জন্য ১ হাজার কোটি টাকাসহ) এবং ১৩. ৮ কিলোমিটার নদী শাসন কাজের ব্যয় (আরটিডবিøউ) হয় ৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
২০১৭ সালের ৭ অক্টোবর শরিয়তপুরের জাজিরা পয়েন্টে পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যান স্থাপন করা হয়। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণ কাজ শুরু করা হয় এবং প্রধানমন্ত্রী ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর শরিয়তপুর জেলার জাজিরা পয়েন্টে নদী শাসন ও পদ্মা বহুমুখী সেতুর মূল নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী ২০০১ সালের ৪ জুলাই মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় পদ্মা সেতুর আনুষ্ঠানিকভাবে ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন করেন। ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের পর তিনি ১৯৯৭ সালে জাপান সফর করেন। তিনি পদ্মা ও রূপসা নদীর উপর সেতু নির্মাণের জন্য জাপানের কাছে প্রস্তাব দেন। জাপান সরকার এ দুই নদীর উপর সেতু নির্মাণের ব্যাপারে সম্মত হন। নদী হিসেবে পদ্মা একটি প্রমত্তা নদী। এ নদীটি অত্যন্ত খর্বতা। জাপান তার অনুরোধে পদ্মা ও রূপসা নদীর নির্মাণের সম্ভাব্যতা জরিপ করে রূপসায় সেতু নির্মাণ কাজ শুরু করেন।
২০০১ সালে জাপান পদ্মা নদীর উপর সেতু নির্মাণের বিষয়ে বাংলাদেশের কাছে সম্ভাব্যতা জরিপ প্রতিবেদন জমা দেয়। জাপানের জরিপ প্রতিবেদনে পদ্মা সেতুর নির্মাণ স্থল হিসেবে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া পয়েন্ট নির্মাণ করা হয়। জরিপের ওপর ভিত্তি করে প্রধানমন্ত্রী ২০০১ সালের ৪ জুলাই মুন্সিগঞ্জের মাওয়ায় আনুষ্ঠানিক ভাবে পদ্মা সেতুর ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন করেন। তবে, আওয়ামী লীগ ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসতে পারেনি। ক্ষমতা গ্রহনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার মাওয়া পয়েন্টে এই সেতুর নির্মাণ কাজের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় এবং মানিকগঞ্জের আরিচা পয়েন্টে পদ্মা সেতুর জন্য ফের জরিপ চালাতে জাপানকে অনুরোধ জানায়। দ্বিতীয় দফা জরিপের পর জাপান পদ্মা সেতু নির্মাণের স্থান হিসেবে মাওয়া পয়েন্টে নির্ধারণ করে প্রতিবেদন জমা দেন। ২০০৯ সালে আবারও ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তালিকায় পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ অন্তর্ভুক্ত করেন। দায়িত্ব গ্রহণের ২২তম দিনে নিউজিল্যান্ড ভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মোনসাল ইকম’কে পদ্মা সেতুর নকশা প্রস্তুত করার দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রথমে এ সেতু প্রকল্পে রেলওয়ে সুবিধা ছিলো না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী, সেতুর চুড়ান্ত নকশায় রেল লাইন সুবিধা রাখা হয়। ২০১০ সালে এ নকশা চুড়ান্ত করা হয়। পরের বছর জানুয়ারিতে ডিপিপি সংশোধন করা হয়। সংশোধনের কারণে এই প্রকল্প ব্যয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা দাঁড়ায়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক্ষেত্র ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে বিভিন্ন কারণ ছিলো। শনিবার বেলা ১১টায় তিনি অনুষ্ঠানস্থলে এসে এসব কথা বলেন। এসময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতু মন্ত্রী ওবাইদুল কাদেরসহ অন্যান্য এমপি, মন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সেই সাথে প্রধানমন্ত্রী’র নিরাপত্তায় গোয়েন্দা সংস্থা’র সদস্য ও পুলিশ, র‌্যাব বাহিনী কাজ করেছেন। পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে ভিন্ন সাজ সেজেছে নদীর দুই পাড়ে তিন দিন ব্যাপী আনন্দ মেলা ও ডিজে গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এদিকে বরিশাল ও খুলনাসহ ২১টি জেলার মানুষ খুবই খুশি ও আনন্দ উপভোগ করছেন এই পদ্মা সেতু নির্মাণ করায়। তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ, অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *