আব্দুল্লাহ সরদার স্টাফ রিপোর্টার:
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বাগেরহাটের বিশ্ব ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার দর্শনার্থীর সংখ্যা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঈদের তিনদিনে আগত মানুষের সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এই ঐতিহাসিক মসজিদকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়। ১৫শ শতকে খান জাহান আলী (রহ.) নির্মিত এ মসজিদ শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, এটি দেশের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন। মসজিদ চত্বরে থাকা যাদুঘর, বিভিন্ন রাইডস, বাহারি ফুলের বাগান এবং মসজিদের উত্তর পাশের বিশাল ঘোড়াদিঘি দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করছে। ঈদের আনন্দ ও দীর্ঘ ছুটির সুযোগে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে ছুটে আসছেন।১৬০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০৮ ফুট প্রস্থের এই মসজিদে কেউ আসছেন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে, কেউ পরিবার নিয়ে, আবার কেউ একাকী ইতিহাসের স্মৃতিচারণে। ঐতিহাসিক এই স্থানে এসে সবাই মুগ্ধ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
ষাটগম্বুজ জাদুঘরে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে মহান আউলিয়া হযরত খান জাহান আলী (রহ.) ব্যবহৃত মাটির বাসন, তৈজসপত্র ও টাকশালের তাম্রমুদ্রা। এছাড়া এখানে সংরক্ষিত রয়েছে খানজাহান আলী দিঘির মমিকৃত কালাপাহাড় নামক কুমির। জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণ বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন, ঐতিহাসিক মানচিত্র এবং লিপিবদ্ধ ইতিহাস। পাশেই রয়েছে খান জাহান আলীর বসতভিটা, যেখানে খননকালে পাওয়া মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সমাহারে সমৃদ্ধ হয়েছে ষাটগম্বুজ জাদুঘর।
এদিকে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টুরিস্ট পুলিশের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।
আজ বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার দর্শনার্থীদের সংখ্যা অনেক বেশি। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত কৌতূহলী দর্শনার্থীরা ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো প্রাণভরে উপভোগ করছে। দীর্ঘ সময় ঘুরে ক্লান্ত হয়ে উঠলে বিশ্রাম নিচ্ছেন আধুনিক ডিজাইনের বাংলো ও বেঞ্চে। সেখানে বসেই উপভোগ করছেন দিঘির অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং পশ্চিম দিগন্তে সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। দর্শনার্থীরা ষাটগম্বুজ মসজিদ ভ্রমণের প্রতিটি মুহূর্ত স্মৃতির পাতায় ধরে রাখতে কেউ সেলফি তুলছেন, কেউ বন্ধু-বান্ধব ও স্বজনদের সঙ্গে ক্যামেরাবন্দি হচ্ছেন।
মাগুরা থেকে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী রুবেল বলেন, এতোদিন শুধু বইয়ের পাতায় এবং সকলের মুখে শুনেছি যে ষাটগম্বুজ মসজিদে ষাটটি গম্বুজ রয়েছে। কিন্তু এবার বাস্তবে এসে দেখলাম, এখানে মোট ৮১টি গম্বুজ রয়েছে। বইয়ের তথ্যের চেয়ে বাস্তবে দেখে আরও বেশি ভালো লেগেছে।
খুলনা থেকে ঘুরতে আসা কলেজ শিক্ষার্থী আসিফুর রহমান বলেন, বাগেরহাট আমার পার্শ্ববর্তী জেলা হলেও আগে কখনো এখানে ঘুরতে আসা হয়নি। শুধু বন্ধু-বান্ধবের মুখে শুনেছি। এবার ঈদ উপলক্ষে ষাটগম্বুজ মসজিদে ঘুরতে এসেছি। এখানে এসে খুব ভালো লাগছে, মাঝে মাঝে এখানে আসব।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাগেরহাটের কাস্টোডিয়ান মো. জায়েদ জানান, এখানে ঈদ পরবর্তী তিন দিনে ২০ হাজার ৪০০ দর্শনার্থীর সমাগম ঘটেছে, যা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। দেশি দর্শনার্থীদের পাশাপাশি বিদেশি দর্শনার্থীরাও এসেছেন। ইংল্যান্ড, জার্মানি, জাপানসহ বেশ কয়েকটি দেশ থেকে ২৫ জন দর্শনার্থী এখানে ঘুরতে এসেছেন।
যাদুঘরের বিভাগীয় প্রকাশনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ফারজান পারভিন মিতা জানান, ঈদুল ফিতরের দিনে টিকিট বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ৯ হাজার টাকার।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক আহমেদ কামরুল হাসান বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্পূর্ণ সচেতন রয়েছে। সবার প্রতি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা আন্তরিক।
উল্লেখ্য, ষাটগম্বুজ মসজিদ নামে পরিচিত হলেও এখানে মোট গম্বুজ রয়েছে ৮১টি। সারাদিন ঘুরতে প্রতিটি দর্শনার্থীর জন্য ৩০ টাকা, মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর জন্য ১০ টাকা, বিদেশি পর্যটকের জন্য ৫০০ টাকা এবং সার্কভুক্ত দেশগুলোর পর্যটকদের জন্য ২০০ টাকা টিকিট মূল্য নির্ধারিত রয়েছে।