মোঃ রফিকুল ইসলাম, শ্রীপুর (গাজীপুর) থেকে: গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার সাধারণ মানুষ প্রতিদিন বাজারে গিয়ে কিসের মাংস কিনছেন—তা নিয়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। কসাইরা প্রতিদিন যে পশু জবাই করছেন, তা কি সুস্থ নাকি রোগাক্রান্ত, নাকি মরা গরু—তার কোনো সদুত্তর নেই কারও কাছে। সরকারি ‘পশুজবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন’কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে অনিরাপদ ও পচা মাংস।সম্প্রতি উপজেলার নিজ মাওনা গ্রামে পচা মাংস বিক্রির অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এক মাংস ব্যবসায়ীকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করার পর এই থলের বিড়াল বেরিয়ে এসেছে। এই ঘটনার পর পুরো শ্রীপুর জুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।নিজ মাওনায় হাতেনাতে ধরা, অন্তরালে বিশাল সিন্ডিকেট অনুসন্ধানে জানা গেছে, শ্রীপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একশ্রেণি’র অসাধু মাংস ব্যবসায়ী গভীর রাতে বা ভোররাতে গোপনে অসুস্থ, মুমূর্ষু এবং ক্ষেত্রবিশেষে মরা গরু জবাই করে তা বাজারে সাধারণ ক্রেতাদের সামনে তাজা মাংস হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছে। নিজ মাওনা গ্রামের ঘটনাটি এর একটি বাস্তব প্রমাণ মাত্র। সেখানে পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত মাংস বিক্রির খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এবং অপরাধীকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করে। অনুসন্ধানী দলের কাছে এই অভিযানের ভিডিও ফুটেজ, পচা মাংসের ছবি এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভের পর্যাপ্ত প্রমাণ সংরক্ষিত রয়েছে।আইন কেবল কাগজে-কলমে, নেই কোনো ‘ভেটেরিনারি সার্টিফিকেট’২০১১ সালের ‘পশুজবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন’ অনুযায়ী, যেকোনো পশু জবাইয়ের আগে সরকারি ভেটেরিনারি সার্জন (পশু ডাক্তার) দ্বারা পরীক্ষা করিয়ে সেটিকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও খাবার উপযোগী হিসেবে লিখিত সনদ (সার্টিফিকেট) নিতে হয়। অথচ শ্রীপুর উপজেলার কোনো বাজারে বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই আইনের কোনো প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। কোনো কসাইয়ের কাছেই পশুর সুস্থতার কোনো ছাড়পত্র বা সার্টিফিকেট নেই। সম্পূর্ণ অন্ধকার এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, কোনো পরীক্ষা ছাড়াই প্রতিদিন শত শত পশু জবাই করা হচ্ছে।ঘটনাস্থলে উপস্থিত ইউপি সদস্যের ক্ষোভ ও দাবি নিজ মাওনা গ্রামে পচা মাংস উদ্ধারের দিন ঘটনাস্থলে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় ইউপি সদস্য (মেম্বার) আমজাদ হোসেন। এই নোংরা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “জনসাধারণ যেন সবসময় সুস্থ, সবল ও নিরাপদ গরুর মাংস খেতে পারে—সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। মানুষ নিজের টাকায় বাজার থেকে কী কিনে খাচ্ছে, তা জানার সম্পূর্ণ অধিকার তাদের আছে। এই অপরাধ রুখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর আইনি প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই।” তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো মূল্যে এই পচা মাংসের কারবারিদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। তীব্র জনবল সংকট, তবুও কঠোর হচ্ছে প্রাণী অধিদপ্তরএই পচা মাংস ও সার্বিক অনিয়মের বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ULO) ডা. মো: আশরাফ হোসেন বলেন, “তীব্র জনবল সংকটের কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সব বাজার একসাথে মনিটরিং করা কঠিন হচ্ছে। তবে কসাইরা যেভাবে পশুজবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন অমান্য করছে, তা দণ্ডনীয় অপরাধ। নিজ মাওনার ঘটনার পর আমরা নজরদারি বাড়াচ্ছি। সরকারি নিয়ম মেনে জনসম্মুখে সুস্থ পশু জবাই নিশ্চিত করতে কসাইদের বাধ্য করা হবে; অন্যথায় আরও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”প্রাণী অধিদপ্তরকে সাথে নিয়ে কঠোর অভিযানের হুঁশিয়ারি ইউএনও’র পচা মাংস বিক্রি এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ নাহিদ ভূঞা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “জনস্বাস্থ্য নিয়ে কোনো রূপ ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না। পচা ও অনিরাপদ মাংসের এই সিন্ডিকেট ভাঙতে আমরা উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে সাথে নিয়ে যৌথভাবে মাঠে নামছি। প্রতিটি বাজার ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কঠোর হস্তে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনা করা হবে।”অন্ধকারে জনস্বাস্থ্য, দীর্ঘমেয়াদী রোগের ঝুঁকিমেডিকেল বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগাক্রান্ত বা মরা গরুর মাংস খেলে লিভার নষ্ট হওয়া, ক্রনিক ডায়রিয়া, ফুড পয়জনিং এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ হতে পারে। শ্রীপুরের সাধারণ মানুষের দাবি, কেবল জরিমানা করেই এই সিন্ডিকেটকে থামানো যাবে না। উপজেলার প্রতিটি বাজারে নিয়মিত মাংসের গুণগত মান পরীক্ষা করা এবং প্রতিটি কসাইকে সরকারি সনদ ও সিলের আওতায় নিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি।
শিরোনাম:
শ্রীপুরে পচা ও ভেজাল মাংসের রমরমা ব্যবসা: অন্ধকারে জনস্বাস্থ্য, নিয়মের তোয়াক্কা করছেন না কসাইরা
-
Reporter Name - Update Time : ০৫:২৭:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬
- 64
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ






